কক্সবাজার, বুধবার, ২৯ জুন ২০২২

শিরোনাম

মাতারবাড়ীতে কাজ শেষ হওয়ার আগেই ধসে পড়ছে বেড়িবাঁধ : শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে লক্ষাধিক মানুষ


প্রকাশের সময় :১৮ মে, ২০২২ ১২:০১ : পূর্বাহ্ণ

কাইমুল ইসলাম ছোটন, মহেশখালী:

কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে বেড়িবাঁধ নির্মাণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠেছে দীর্ঘদিন ধরে। কাজ শেষ হওয়ার আগেই বেড়িবাঁধ ধসে পড়ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। ফলে শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন লক্ষাধিক মানুষ। বুক চাপা কষ্ট নিয়ে দিক ওদিক ঘুরলে ও কোন সুরাহা মিলছে না তাদের।

স্থানীয়রা জানান, বেড়িবাঁধ নির্মাণের শুরু থেকে আমরা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলেছি। কিন্তু কোন ব্যবস্থা হয়নি বরং আমাদের উচ্ছেদ ও মামলার ভয় দেখানো হয়েছে। নকশা অনুয়ায়ী কাজ না করে বেড়িবাঁধের বিভিন্ন জায়গায় মাটি কম দেওয়া থেকে শুরু করে বসতভিটা থেকে মাটি নেওয়ার কারণে বর্ষাকালে পানি জমে থাকার পাশাপাশি পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু হবে। কর্তৃপক্ষ বেড়িবাঁধ ঘেঁষে বালু উত্তোলন করার কারণে বেড়িবাঁধটি পুনরায় ধসে পড়ছে। এর আগেও এমন অনিয়ম হয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। ফলে বারবার সরকারের কোটি কোটি টাকা গচ্ছা যাচ্ছে। সঠিকভাবে সংস্কার করা না হলে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে আরও বড় ধরনের ভাঙন দেখা যেতে পারে বলে জানান।

স্থানীয়রা আরও বলেন, জোয়ারের পানি বৃদ্ধির ফলে লোকালয়ে এখনো পানি প্রবেশ করছে। ঠিকাদাররা প্রভাবশালী হওয়ায় তদারকির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিও কোন কথা বলতেছে না। ঠিকাদার দায়সাড়া ভাবে কাজ করে এভাবে অর্থ লুট করছেন। এভাবে চললে অস্তিত্ব সংকটে পড়বে মাতারবাড়ীর মানুষ। তবে এমন অভিযোগ অস্বীকার করছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে ঘূর্ণিঝড়ে ভেঙে যাওয়া বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ কোটি টাকা। ৮০০ মিটারের বেড়িবাঁধটি নির্মাণের জন্য ৮ প্যাকেজের মাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন এলাকা নির্ধারণ করে কাজ বন্টন করা হয় ঠিকাদারদের। চলতি বছরের জুন মাসে এই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে। সম্পন্ন কাজ হওয়ার পর ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে টাকা দেওয়া হবে। কিন্তু জুনে কাজ হওয়ার কথা অস্বীকার করে নির্বাহী প্রকৌশলী বলেছেন, প্রথমে আমরা কাজ সম্পন্ন করেছি। এখন নতুন করে কাজ করা হচ্ছে।

অন্যদিকে ধলঘাটা ইউনিয়নের হামিদখালী নতুন ঘোনা (আঞ্চলিক) এলাকার বেড়িবাঁধের একই অবস্থা। বেড়িবাঁধের ভাঙা অংশ দিয়ে জোয়ারের পানি প্রবেশ করে, যে কোন মূহুর্তে বড় ক্ষতির মুখোমুখি হতে পারেন স্থানীয়রা। দ্রুত সংস্কারের দাবি জানান এলাকাবাসী।

সরেজমিনে বেড়িবাঁধ এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ৮০০ মিটারের বেড়িবাঁধ নির্মাণে ব্যাপক অনিয়মের ফলে এক ঠিকাদারের কাজের সাথে অন্য ঠিকাদারের কাজে কোন মিল নেই। আঁকাবাঁকা বেড়িবাঁধে নির্মাণ করে কেউ কোন জায়গায় মাটি, কেউ কোথাও জিওব্যাগ বেশি বা কম দিচ্ছেন। দেখলে বুঝা যায়, কি রকম অনিয়ম হচ্ছে! শর্ত অনুয়ায়ী, প্রস্থ ১০ মিটার হওয়ার কথা থাকলেও অনেক জায়গায় ৮/৯ মিটার। অনেকে দিচ্ছে না নিয়মমাফিক জিওব্যাগ। তাছাড়া নির্মাণাধীন বেড়িবাঁধের ৫ টি স্থানে জিওব্যাগসহ মাটি ধসে পড়ে গেছে। অনেক জিওব্যাগ সমুদ্র সৈকতে চলে গেছে। আরও ১০ টি জায়গায় বড় ফাটল ধরছে বেড়িবাঁধের। ফলে যেকোন মুহূর্তে বেড়িবাঁধ ভেঙে প্লাবিত হতে পারে গ্রামের পর গ্রাম। শুধু তাই নয়, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অনিয়মের কারণে ৯ মিটার বেড়িবাঁধে কোন জিওব্যাগ দেয় নেই কোন ঠিকাদার। বরং খোলা অংশে মাটি দেওয়ায় মাটিগুলো নিয়ে ফেলেছেন এক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। বারবার নিষেধ স্বত্তেও নির্মাণের সময় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গুলো বেড়িবাঁধ ঘেঁষে বালু উত্তোলনের ফলে এই বেড়িবাঁধটি আবারও ধসে পড়েছে বলে স্থানীয়রা জানান।

স্থানীয় বাসিন্দা পারভীন বলেন, এখনো বর্ষা আসেনি। কাজ শেষ হওয়ার আগে বেড়িবাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। এটা ছাড়া অন্য জায়গা নেই, ৩ সন্তান নিয়ে কোথাও যাব জানিনা।

স্থানীয় মুজাম্মেল হক বলেন, বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য বসতভিটা থেকে মাটি নেওয়া হয়েছে। ফলে এখানে গর্ত তৈরি হওয়ায় বর্ষাকালে বাচ্চা পানিতে ডুবে মরে যেতে পারেন। বারবার বেড়িবাঁধ সংস্কার হলেও আমাদের শঙ্কা কাটছে না।

?????????

স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ার ফলে বিগত কয়েক বছরে প্রায় ১০০ টি পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়েছেন। নিঃস্ব হয়ে বাধ্য হয়েছেন অন্যত্র চলে যেতে। কেউ কেউ মাথা গোঁজানোর ঠাঁই নিয়েছেন আত্মীয়ের বাসায়। টেকসই বেড়িবাঁধ না হলে মাতারবাড়ী-ধলঘাটার প্রায় লক্ষাধিক মানুষ অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। তারা টেকসই বেড়িবাঁধের দাবি জানান।

মাতারবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এস.এম আবু হায়দার বলেন, মাতারবাড়ীর বেড়িবাঁধ টেকসই হওয়া দরকার। টেকসই বেড়িবাঁধ না হলে মাতারবাড়ীকে রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে। তিনি ও দ্রুত টেকসই বেড়িবাঁধের দাবি জানান।

এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী ড. তানজির সাইফ আহমেদ জানান, মাতারবাড়ীতে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য নকশা পাঠানো হয়েছে। স্থানীয়দের রক্ষা করার জন্য বর্তমানে জিওব্যাগ দিয়ে অস্থায়ী বাঁধ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু পানির ধাক্কা খেয়ে বেড়িবাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। বেড়িবাঁধ নির্মাণে ৯ মিটার খালি অংশের বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, নকশাতে ভুলক্রমে এটা হিসাব করা হয়নি। তাই খালি পড়ে আছে। কয়েকদিনের মধ্যে ঠিক করে দেওয়া হবে তিনি জানান।

বেড়িবাঁধের কাছ থেকে বালি উত্তোলন করলে বেড়িবাঁধ ক্ষতি হয় কিনা প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এতে কোন ক্ষতি হয় না। মানুষ আমাদের (পানি উন্নয়ন বোর্ডের) জায়গায় ঘরবাড়ি গড়ে তুলেছেন, এখান থেকে বালি নেওয়ার নিয়ম আছে। বেড়িবাঁধ নির্মাণে কোন অনিয়ম হচ্ছে না বলে তিনি জানান।

উল্লেখ্য যে, এর আগেও ‘দৈনিক আপন কণ্ঠ’ পত্রিকায় মাতারবাড়ীর বেড়িবাঁধের অনিয়ম নিয়ে দুইটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছিল।

ট্যাগ :