কক্সবাজার, বুধবার, ২৯ জুন ২০২২

শিরোনাম

“নিষ্ঠুর বিধিলিপি” -সুলেখা আক্তার শান্তা’র ছোট গল্প


প্রকাশের সময় :১৫ মে, ২০২২ ১:০৯ : পূর্বাহ্ণ

“নিষ্ঠুর বিধিলিপি”

——————————————————————————-

সুলেখা আক্তার শান্তা

পাতিল ভরে ভাত রান্না করেও দুই বোনের কপালে ভাত জোটে না। সংসারে অভাব আছে তাতো আমরা জানিই। তবুও দেখি অনেক পরিবারে অভাবে থাকলে খাবার যা হয় সবাই মিলেমিশে খায়। খাবার নিয়ে কাউকে বঞ্চনা গঞ্জনা সহ্য করতে হয় না। বাবার যে আয় তাতে সংসার চলে না এই কথাই শুধু আপনের। আর আপনি শুধু অভাবের কথা বলে খাওয়ার সময় আমাদের দুই বোনকে তাড়িয়ে দেন। এই কথা বললেও ভয় অন্তরে পানি নাই রুপার। তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে শেফালী। ও, আমি সৎ মা দেইখা আমার নামে বদনাম দিস! তোদের দুই বোনের ভাত বন্ধ। আমি সৎমা খাওয়াইলোও বদনাম হইব না খাওয়াইলোও বদনাম হইবে। আমি বললাম আর তোদের প্লেটে ভাত বারবো না।

শেফালির হাতে ঝাড়ু ছিল সেটা দেখিয়ে অগ্নি বর্ষণ করলো। রুপার শরীরে ভয়ে কাঁপন উঠে। রুপার গায়ে যখন তখন লাঠির বাড়ি পড়ে। এতেও শেফালির পরান ঠান্ডা হয়না। স্বামীর কাছে ইনিয়ে বিনিয়ে বলবে, তারপর সে যদি মারে তাতে তার পরান একটু শান্ত হয়। রুপা বলে, আহ কেন যে কথাগুলো বললাম! ক্ষুধার জ্বালায় পেটের ভিতর দাউ দাউ করছে। না বলেই বা কি করবো। বলছি তো বলছিই, যা হবার হবে এখন বাড়ি থেকে পালাই। রুপা নেত্রকোনা শ্যামগঞ্জ বাস স্ট্যান্ড এসে দাঁড়ায়। এদিক ওদিক তাকায়, কি করবে কিছুই বুঝতে পারে না।

বাসস্ট্যান্ডে নেত্রকোনা থেকে ঢাকাগামী বাস দাঁড়ায়। অসহায় রুপা চোখে পানি ছল ছল করছে। সোহেল আহমেদ বাস থেকে নেমে সিগারেট ধরায়। তাকিয়ে দেখে রুপাকে। চোখেমুখে অসহায় অভিব্যক্তি। তুমি কাউকে খোঁজো? রুপা বলে, আমি কোথাও চলে যাব। কোথায় যাব জানিনা। তুমি আমার সঙ্গে চলো। রুপাকে বাসায় নিয়ে আসে সোহেল আহমেদ। সমস্যার আশঙ্কা থাকলেও স্ত্রীকে বুঝিয়ে বলতে পারবে সে বিশ্বাস ছিল। স্ত্রী বিলকিসের কাছে বিস্তারিত বলেন তিনি। বিলকিস বলেন, পড়ালেখা থাকলে চাকরি দেওয়া যেত এখন কি করা যায়। একপারে বাসার কাজ করতে। রুপা গৃহকর্মীর কাজ করতে থাকে। সংসারী কাজকর্মে রুপা বরাবরই পটু।

সব কাজে যত্ন এবং আন্তরিকতা থাকে যেন নিজ পরিবারের কাজ। গৃহকর্তা-কর্ত্রী সোহেল আহমেদ ও বিলকিস আহমেদ দু’জনেই খুব স্নেহ মায়া-মমতা তাদের ভালোবাসার আন্তরিকতার আপন করে নেয় রুপাকে। তাঁরা রুপাকে খুবই ভালবাসে। রুপা প্রেমে পড়ে বাসার দারোয়ান পলাশের। পলাশের খুব খাতির যত্ন করে রুপা। বাসার কাজের শেষ পলাশের সঙ্গে গল্প আলাপে মেতে থাকে। বিষয়টি সোহেল আহমেদ ও বিলকিস আহমেদের দৃষ্টিতে পরে। তাঁরা দু’জনেই রুপাকে বুঝায়, তোকে আমরা ভালো ছেলে দেখে বিয়ে দেব। কিন্তু রুপা বুঝ নেয় ঠিকই তারপরও পলাশের সঙ্গে সম্পর্কও চালিয়ে যায়। তার হৃদয় পলাশকে ছাড়া কিছুই বোঝে না। সোহেল আহমেদ ও বিলকিস আহমেদ আমেরিকাতে যাবে। মূলত আমেরিকাতেই তাঁদের বসবাস। কয়েক বছরের মাথায় ছয় মাসের জন্য আসে দেশে। ছয় মাস থেকে আবার চলে যায়।

এবার ফেরার সময় তাঁরা রুপাকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে আমেরিকাতে। রুপা বছর খানেক পলাশের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে না। একদিন তার মনে হলো পলাশের কথা। পলাশের সঙ্গে যোগাযোগ করে। আবার শুরু হয়ে যায় ভালবাসার আলাপ। পলাশের জন্য রুপার মন খুব উতলা হয়ে পড়ে। পলাশকে দেখতে ইচ্ছা করে। কোন কাজে মন বসে না তার। ভালো লাগেনা কোন কাজ করতে। কাজকর্ম ফেলে রেখে পলাশের সঙ্গে আলাপে মজে থাকে। আমেরিকাতে সোহেল আহমেদ বিলকিস আহমেদ দু’জনেই চাকরি করে। অফিস থেকে ফিরে দেখে বাড়ির সব কাজকর্ম তেমনি পড়ে আছে। এমনকি রান্নাবান্নার কোন কাজও করিনি রুপা। বিলকিস আহমেদ জিজ্ঞেস করেন, তোর কি শরীর খারাপ? না। তাহলে কাজ ফেলে রেখে বসে আছিস কেন? আমার কিছু ভালো লাগেনা, আমাকে দেশে পাঠিয়ে দেন। দেশে পাঠিয়ে দেবো! কত দুঃখ করেছিস সে কথা মনে আছে? দুঃখ করছি সে কথা মনে আছে, আপনার আমাকে অনেক আদর ভালোবাসা দিয়েছেন তাও মনে আছে। আমি ভালোবাসি পলাশকে ওর জন্য আমি দেশে ফিরতে চাই। আমার মনে হয় আমাদের বুঝ কাজে লাগবে না।

তোকে দেশে পাঠানোই ভালো কিন্তু তুই আর আমাদের কাছে ফিরতে পারবি না। ঠিক আছে, আমাকে পাঠিয়ে দেন। তবুও একবার ভেবে দেখ? না, আমি ভাবতে চাইনা। রুপাকে দেশে ফেরার সময় বেতনের বাদেও বাড়তি টাকা দেয় তাঁরা। এরুপা দেশে আসে। পলাশকে বিয়ে করে। রুপা পলাশের হাতে টাকা পয়সা সব তুলে দেয়। কিছু টাকা রাখে বাবাকে দেওয়ার জন্য। রুপা স্বামীকে নিয়ে বাবার বাড়ি যায়। মজিদ মেয়েকে পেয়ে খুশিতে আত্মহারা। মা তুই আইসিস? মজিদ ব্যাগ হাতে নিয়ে বাজারে যায়। তাড়াতাড়ি বাজার নিয়ে আসে মেয়ের আর জামাইকে খাওয়াবে। ছোট বোন এনি বলে বড় বোন রুপাকে, তোমার সঙ্গে কথা বলব না। তুমি আমাকে ফেলে চলে গেছো। কত দুঃখ করতে হয়েছে আমাকে জানো? একসঙ্গে থাকলে দুই বোনে দুঃখ ভাগাভাগি করে নিতাম। গেছি কি এমনি! দুঃখর জন্যই তো বাড়ি থেকে চলে গেছি। এখন সুখ নিয়ে বাড়ি ফিরে আইছো? রাতে খাওয়া দাওয়া শেষ হলে রুপা বাবার হাতে দুই লাখ টাকা দেয়। টাকা দেখে মা শেফালী থাবা দিয়ে টাকাটা নিজের কাছে নেয়। তোর বাবার কিছু মনে থাকে না। এই টাকা আমার কাছে থাক। আরে এত টাকা জীবনে একসাথে চোখে দেখি নি।

ওদিকে শ্বশুরকে টাকা দেওয়া দেখে পলাশ রাগে ফুঁসতে থাকে। মনে মনে বলে, চলো আগে ঢাকায় যাই তারপরে এই টাকা দেওয়ার মজা বুঝাবো। বাড়ি থেকে ঢাকা ফেরার সময় এনি বোনকে বলে, আপা আমাকে তোমার সঙ্গে ঢাকা নিবা? আমারও ঢাকা দেখা হলো মনটাও কয়দিনের জন্য শান্তিতে থাকতে পারলো। পলাশ ইশারায় না নেওয়ার জন্য বলে। এনি কয়েকদিন স্বস্তির পাওয়ার আশায় বোনের কাছে ঢাকায় যাবে বলেছিল কিন্তু বোনের সঙ্গে তার যাওয়া হয়না। ঢাকায় আসার পর পলাশ জিজ্ঞেস করে রুপাকে তুই তোর বাবাকে টাকা দিয়েছিস কেন? রুপা বলে বাবারও তো সন্তানের টাকা-পয়সা পাওয়ার হক আছে। রুপা কিছুই বুঝে উঠার আগেই পলাশ রুপাকে বেদম মার। এই জন্যই কি তোমার সংসার করতে বিদেশ থেকে চলে আসছি, তোমার মাইর খাওয়ার জন্য? কথা বলবি তো পা ভেঙ্গে দিব।

পলাশ চোখের পলকে রান্নাঘর থেকে পুতা এনে রুপার পায়ের সজোরে আঘাত করে। রুপা যন্ত্রনায় চিৎকার করে বলে, আমার একি সর্বনাশ করলে। আমার পা পঙ্গু করে দিলে। এবার তুই থাক বিছানায় পড়ে। পলাশ রুপাকে ঝাড়ি মেরে বলে, আমি পুরুষ মানুষ আমি দশটা বিয়ে করলেও আমার কোন সমস্যা নাই। কিন্তু তুমি মেয়ে মানুষ এক বিয়েতেই তোদের জীবন শেষ। পলাশ ঘরের জিনিসপত্র নিয়ে চলে যায়। পঙ্গু রুপার কোন কিছুই করার থাকেনা। নিরুপায় রুপার দিন চলে না। খুঁড়িয়ে চলা ফেরা করতে হয়। সেই অবস্থাতেই এক বাসায় কাজ নেয়। বৃদ্ধা জহুরার দেখাশোনার দায়িত্বের চাকরি। এনি বোন রুপাকে ফোন দিয়ে বলে, আমি আর বাড়ির জ্বালা যন্ত্রণা সইতে পারছিনা। আমি ঢাকায় এসে কোন কাজ করে খাব তাও আমি এখানে থাকবো না।

রুপা কি করবে নিজের হাতে কোনো টাকা পয়সা নেই যা দিয়ে বোনের খরচ মিটায়ে বিয়ে-শাদী দিবে। রুপা ভাবতে থাকে এনি ঢাকায় এলে তাকে কি কাজে দেওয়া যায়। অবশেষে একটি কাজের সন্ধান পায়। মোকলেস বিভিন্ন বিয়ের অনুষ্ঠানে মেয়েদের দিয়ে নাচের পার্টি করায়। এনি সেই নৃত্য দলে কাজ পায়। এনি ও প্রশিক্ষণের কারণে তাড়াতাড়ি নাচ শিখে নেয়। চিটাগাংগে এক বিয়ের অনুষ্ঠানে মোকলেস এনিকে নিয়ে যায়। নাচের প্রোগ্রামের শেষে এনির প্রচন্ড পেট ব্যথা শুরু হয়। মোকলেস ঘাবড়ে যায় কি হলো এনির! ডাক্তার দেখায়, পরীক্ষা-নিরীক্ষায় জানা যায় এনির পেটে টিউমার। দ্রুত রোগীর অপারেশন করাতে হবে। মোকলেস রুপাকে বিষয়টি জানায়। রুপা বলে, আমার কাছে কোনো টাকা নাই। আমার নিজের চিকিৎসাই করতে পারছিনা।

মোকলেস ভাবে এনিকে দিয়ে তার তেমন কোন ইনকাম হয় নাই। বরঞ্চ ওর পিছনে নাচের প্রশিক্ষণ প্রস্তুতিতে অনেক খরচ হয়েছে। মোকলেস এনিকে কোনো কিছু না বলে এনিকে ফেলে ঢাকায় চলে আসে। এনি ব্যথার তীব্র যন্ত্রণায় রাস্তায় পড়ে কাতরাতে থাকে। সৎমার তীব্র জ্বালা যন্ত্রনায় এতই ছিল নিজের শারীরিক ব্যথা এতদিন হয়তো এনি অনুভব করতে পারেনি। এনির পেটের টিউমার বাস্ট হওয়া রাস্তায় তার মৃত্যু হয়। লোকজন পুলিশে খবর দেয়। পুলিশ এসে এনির ব্যাগ তল্লাশি করে একটি ফোন নাম্বার পায় সেই নাম্বারটিতে ফোন দেয়। রুপার কাছে ফোন আসে। লাশটির পরিচয় ব্যাপারে জানতে চায়। রুপা ভাবে টাকার অভাবে নিজের চিকিৎসা করাতে পারছে না বোনের লাশ কিভাবে আনবে। সে পুলিশকে জানায় লাশের কেউ জীবিত নেই। পুলিশ লাশের পরিচিত কারও সন্ধান না পেয়ে বেওয়ারিশ লাশ হিসাবে এনিকে দাফন করে। এনি দুনিয়ায় থাকতে পেল না আদর ভালোবাসা মরেও সে পেলোনা আপনজনের দেওয়া মাটি। নিষ্ঠুর পৃথিবীতে এনি ভাগ্যে নিয়ে এসেছিল নিষ্ঠুর বিধিলিপি।

ট্যাগ :