কক্সবাজার, বুধবার, ২৭ অক্টোবর ২০২১

শিরোনাম

৪২ বছরেও গঠনতন্ত্র পূর্ণাঙ্গ করতে ব্যর্থ ছাত্রদল, দালিলিক ফ্রেমে নিয়ে আসা সাংঘর্ষিক: ইকবাল হোসেন শ্যামল


প্রকাশের সময় :১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ১১:৩৯ : পূর্বাহ্ণ

রাজনীতি ডেস্ক

২০০১ সালের মার্চে ছাত্রদলের তৎকালীন সভাপতি নাসির উদ্দিন পিন্টু বলেছিলেন, ‘ম্যাডাম (খালেদা জিয়া) যা বলবেন—সেটাই আমাদের গঠনতন্ত্র’। সংগঠনের স্বীকৃত গঠনতন্ত্র না থাকার প্রসঙ্গে পিন্টুর এই বক্তব্যের পর পেরিয়ে গেছে ২০ বছর, পিন্টু প্রয়াত হয়েছেন ছয় বছর। ১৯৭৯ সালের ১ জানুয়ারি আত্মপ্রকাশের পর থেকে সবমিলিয়ে ৪২ বছর ধরে খসড়া গঠনতন্ত্র দিয়েই চলছে বিএনপির সহযোগী সংগঠন ছাত্রদল। ২০১৯ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর বর্তমান কমিটি নির্বাচনের আগে গঠনতন্ত্র চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হলেও অদ্যাবধি তা শেষ হয়নি।

ছাত্রদলের সাবেক সিনিয়র কয়েকজন নেতা জানান, ১৯৯৭-৯৮ সালের কমিটির সময় খসড়া গঠনতন্ত্র প্রণয়ন করা হয়। কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হওয়ায় সাংগঠনিক গঠনতন্ত্রের স্থায়ীরূপ দেওয়া হয়নি। বিএনপির শীর্ষ মহল থেকেও কোনও চাপ ছিল না, আবার যারা দায়িত্বে এসেছেন—তাদের কাছেও বিষয়টি উপেক্ষিত থেকেছে।

খসড়া গঠনতন্ত্রে কোনও কমিটি কত সদস্য, মেয়াদ কেমন হবে ইত্যাদি বিষয়গুলো ছিল; তবে তা কখনও ফলো করা হয়নি জানিয়ে সংগঠনের উচ্চপর্যায়ের একজন সাবেক দায়িত্বশীল বলেন, উচ্চপর্যায় থেকে যখন যাকে প্রয়োজন মনে করা হয়েছে, সেভাবেই নেতৃত্বে আনা হয়েছে। আর এ কারণে গঠনতন্ত্র করার কোনও চাপ তৈরি হয়নি, চূড়ান্ত করা হয়নি গঠনতন্ত্র; যখন যেভাবে মনে করা হয়েছে সেভাবে সংশোধন করা হয়েছে। আর ছাত্রদলের কোনও কমিটি তা পাশও করেনি।

ছাত্রদলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা একাধিক নেতা জানান, ২০১৯ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর কাউন্সিলের আগেই গঠনতন্ত্র চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। বর্তমান সভাপতি ফজলুর রহমান খোকন ও সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন শ্যামলসহ সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকদের সমন্বয়ে একটি টিম এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত।

সংগঠন সূত্র বলছে, কমিটি গঠনের পর ২০২০ সাল থেকে করোনাভাইরাসের সংক্রমণজনিত সাংগঠনিক কার্যক্রম বন্ধ থাকায় পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের পাশাপাশি গঠনতন্ত্র পূর্ণাঙ্গ করার কাজটিও পিছিয়ে যায়। তবে এরইমধ্যে গঠনতন্ত্রের খসড়া চূড়ান্ত করার পথে।

কী আছে খসড়ায়

ছাত্রদলের একাধিক নির্ভরযোগ্য দায়িত্বশীল জানান, আগামী ১ জানুয়ারি সংগঠনের ৪৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে পূর্ণাঙ্গ গঠনতন্ত্র প্রকাশ করতে পারে ছাত্রদল। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে যাবতীয় প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

দায়িত্বশীল নেতারা জানান, বিএনপির সহযোগী সংগঠন হিসেবে দলের লক্ষ্য ও আদর্শ বাস্তবায়নের কাজ করলেও ছাত্রদল মৌলিকভাবে ছাত্রকেন্দ্রীক। ফলে গঠনতন্ত্রে ছাত্রত্ব, বয়সের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। খসড়া গঠনতন্ত্রের ১৭ ধারায় ১৫১ সদস্য বিশিষ্ট সদস্যের কথা উল্লেখ থাকলেও মন্ত্রণালয়ভিত্তিক সম্পাদকমণ্ডলী থাকার কারণে এই সংখ্যা বেড়েছে এবং গঠনতান্ত্রিকভাবেও তা বাড়ানো হবে। সংগঠনের নির্বাহী ক্ষমতা গঠনতান্ত্রিক ও সাংবিধানিকভাবে সরাসরি মূল দলের ‘চেয়ারম্যান’র কাছে অর্পিত থাকবে। এ ছাড়া কমিটির মেয়াদ দুই বছর পর্যন্ত থাকলেও পূর্ণাঙ্গ গঠনতন্ত্রে তা বেড়ে তিন বছর হতে পারে।

প্রসঙ্গত, ২০১৯ সালের অক্টোবরে ছাত্রদলের এক সভায় তারেক রহমানকে খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে সাংগঠনিক ‘অভিভাবক’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। খসড়া গঠনতন্ত্রের ১৮ অনুচ্ছেদে মূল দলের চেয়ারপারসনকে কমিটি বাতিল, সংযোজন, বিয়োজন, নতুন কমিটি গঠন—সবকিছুর সর্বময় ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

গঠনতন্ত্রের কাজের সঙ্গে যুক্ত কেন্দ্রীয় একজন নেতা জানান, ‘গঠনতন্ত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে।’ বর্তমান খসড়া গঠনতন্ত্রে ৩১ টি অনুচ্ছেদ থাকলেও চূড়ান্ত পর্বে তা বাড়তে পারে।

ছাত্রদলের সিনিয়র সহ সভাপতি কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘গঠনতন্ত্রের কাজ সাবেক সিনিয়র নেতৃবৃন্দরা মোটামুটি চূড়ান্ত করেছেন। কিছু-কিছু বিষয় ‘ফিক্স’ করার কোনও সুযোগ নাই। সে কারণে সে বিষয়গুলো কী কী, সেটা এখনও ঠিক হয়নি। কাজটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, ওভাবেই আছে এখনও। পুরো কাজ শেষ হলে বই আকারে প্রকাশ করা হবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক শাজাহান শাওন মনে করেন, একটি সংগঠনের জন্য গঠনতন্ত্র খুবই প্রয়োজন। ছাত্রদলের গঠনতন্ত্র কবে হবে—এটা আমাদের অভিভাবক যখন ঠিক করবেন, তখনই হবে।

যদিও ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন শ্যামল মনে করছেন, ছাত্রদলের মতো সংগঠনকে দালিলিক ফ্রেমে নিয়ে আসা কঠিন। বিশেষ করে সংগঠনকে পরিবেশ, প্রেক্ষাপট ও সময় বিবেচনা করে পরিচালনা করার কারণে দালিলিক ফ্রেমে নিয়ে আসা সাংঘর্ষিক হতে পারে।

ইকবাল হোসেন শ্যামল বলেন, ‘ছাত্রদলের খসড়া একটি গঠনতন্ত্র আছে। খসড়া দিয়েই চলবে। আর আমাদের এজেন্ডার মধ্যে এটা নেই।’

জানুয়ারির আগে পূর্ণাঙ্গ কমিটি

চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে (১৯ সেপ্টেম্বর) ছাত্রদলের বর্তমান কেন্দ্রীয় সংসদের মেয়াদ শেষ হবে। ২০১৯ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সরাসরি ভোটে সংগঠনের সভাপতি হিসেবে ফজলুর রহমান খোকন ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন ইকবাল হোসেন শ্যামল। এর ২ মাস পর ৬০ সদস্যের ‘আংশিক’ কমিটি ঘোষিত হলেও তা ‘আংশিকই’ রয়ে গেছে। গত ৩ সেপ্টেম্বর ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন শ্যামল বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছিলেন, ১৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তারা কমিটি জমা দিতে আশাবাদী।

ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির গুরুত্বপূর্ণ একজন নেতা শুক্রবার (১৭ সেপ্টেম্বর) জানান, ছাত্রদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটির খসড়ার কাজ চূড়ান্ত হয়ে গেছে। এখন কেন্দ্রীয় নেতারা জমা দেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন। বিএনপির শীর্ষ মহলের ‘গ্রিন সিগন্যাল’ পেলেই জমা দেওয়া হবে।

কেন্দ্রীয় কমিটির একজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘আমাদের মধ্যে আলোচনা আছে ১৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ দেওয়া হবে। কিন্তু আজ পর্যন্ত (১৭ সেপ্টেম্বর) কোনও আপডেট নেই।’

জানতে চাইলে ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন শ্যামল বলেন, এখনও কয়েকটি জেলা কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার কাজ বাকি রয়েছে। দফতর বিভাগে কিছু কমিটি জমা হয়েছে। এসব শেষ করার পর পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় কমিটির বিষয়টি আসবে।’

তিনি বলেন, ‘দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সময় দেওয়ার বিষয় রয়েছে। এসব কিছু ঠিক হলেই আমরা প্রস্তাব জানাবো। আমরা আশা করছি, আগামী প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আগেই পূর্ণাঙ্গ কমিটি আসবে।’

ট্যাগ :