কক্সবাজার, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২০

কলাতলীতে হাইকোর্টের আদেশ অমান্য করে বসত-বাড়ি উচ্ছেদ করতে এসিল্যান্ড এর হুমকী


প্রকাশের সময় :৯ অক্টোবর, ২০২০ ৩:৫৬ : অপরাহ্ণ

আপনকণ্ঠ রিপোর্ট:

কক্সবাজারের কলাতলীতে হাইকোর্টের আদেশ অমান্য করে ২০ উদ্বাস্তু পরিবারকে ২৪ ঘন্টার মধ্যে উচ্ছেদের হুমকী দিয়েছেন কক্সবাজার সদর সহকারী কমিশনার (ভুমি) শাহরিয়ার মোক্তার।

বুধবার(৭ অক্টোবর) দুপুর দুইটার দিকে কলাতলী বাইপাস রোডস্থ ভুক্তভোগীদের বসতবাড়ি এলাকায় স্ব-শরীরে উপস্থিত হয়ে তিনি এই হুমকী প্রদান করেছেন বলে জানান ভুক্তভোগী পরিবারের লোকজন।

কোন প্রকার উচ্ছেদ না করতে হাইকোর্টের সুনির্দিষ্ট আদেশে থাকলেও তার তোয়াক্কা না করে এসিল্যান্ড এর এরকম উদ্বত্যপূর্ন ও প্রকাশ্য হুমকীতে চরম নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে ভুক্তভোগী পরিবার।

তারা বলেন-২৪ ঘন্টার মধ্যে নিজ উদ্যোগে বসতবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে না গেলে শুক্রবার আবারো এসে আমাদের বসতবাড়িগুলো গুড়িয়ে দিবেন বলে হুমকী প্রদান করেন। তার এমন হুমকীতে বৃহষ্পতিবার দুপুরে হাইকোর্টের আদেশের সকল নথিপত্র এসিল্যান্ডের অবগতির জন্য পুনরায় প্রদান করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে ও হাইকোর্টের আদেশ পর্যালোচনা করে জানা যায়, কক্সবাজারের কলাতলীতে ঝিলংজা
মৌজার সরকারী ১নং খাস খতিয়ানের ২০১৬৩ দাগের ৯৪.১৮ একর সরকারী খাস জমির আন্দর সুনির্দিষ্ট ট্রেস সম্বলিত এক একর জায়গায় বসবাস করে আসছেন জেলার বিভিন্নস্থানের
জলবায়ু উদ্বাস্তু ২০টিরও অধিক পরিবার।

তাদের বসত-ভিটা রক্ষায় ২০১৭ সালে নীতিমালা অনুযায়ী কক্সবাজার জেলা প্রশাসক বরাবর বন্দোবস্তী পাওয়ার আবেদন করেন। তার ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রীট মামলা দায়ের করেনে ভুক্তভোগী পরিবার।

যার রীট পিটিশন নং- ১০৩৫৪/১৮।

এই রীটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট উক্ত আবেদনকারী ভুক্তভোগী পরিবার বর্গকে
তাদের নির্দিষ্ট ট্রেস অনুযায়ী নির্দিষ্ট জমি বন্দোবস্তি প্রদান এবং হাইকোর্টে মামলাটি চুড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাদের দখলীয় এক একর জায়গা (নীতিমালা অনুযায়ী প্রতি পরিবার ৫শতক করে ২০ পরিবারের মোট ১ একর) থেকে কোন প্রকার উচ্ছেদ না করার জন্য কক্সবাজার জেলা প্রশাসক, এসিল্যান্ড, তহশীলদারসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে সু-স্পষ্ট আদেশ প্রদান করেন মহামান্য হাইকোর্ট।

হাইকোর্টের এই আদেশটি পাওয়ার পর কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো: কামাল
হোসেন আদেশটি বাস্তবায়ন করতে কক্সবাজার সদর সহকারী কমিশনার (ভুমি) কে নির্দেশ দেন।

কিন্তু ততকালীন সদর সহকারী কমিশনার (ভুমি) অনৈতিক সুবিধা না পেয়ে হাইকোর্টের আদেশটির প্রতি অবমাননা করে দুই বছর ফেলে রাখেন।

পরবর্তীতে তা বাস্তবায়নে কোন রকম
পদক্ষেপ না নেওয়ায় কেন হাইকোর্টের আদেশ বাস্তবায়ন করা হয়নি তার জন্য কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো: কামাল হোসেন, সদর সহকারী কমিশনার (ভুমি) শাহরিয়ার মোক্তার ও সদর ভুমি
অফিসের তহশীলদার মো: সাহেদকে “কনটেম্পটচ্ করা হয় ।

যার সমস্ত নথিপত্র রেজি: ডাক যোগে
ও জেলা জজ আদালতের মাধ্যমে (জারিকারক) স্বাক্ষর মূলে গ্রহন করেন তারা।

তবে কার্যত ভুক্তভোগীদের প্রতি হাইকোর্টের দেওয়া আদেশ বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোন পদক্ষেপ নেননি সংশ্লিষ্টরা।

উচ্ছেদের হুমকী দেয়ার বিষয়ে কক্সবাজার সদর সহকারী কমিশনার (ভুমি) শাহরিয়ার মোক্তার সত্যতা
স্বীকার করে বলেন, আমি হাইকোর্টের আদেশের নিষ্পতি করেছি।

এখানে যে স্থাপনা করা হয়েছে তা আমি উচ্ছেদ করবো। উচ্ছেদ না করার জন্য হাইকোর্টের সুনির্দিষ্ট আদেশ থাকলেও কেন এই জলবায়ু উদ্বাস্তু পরিবারগুলোকে উচ্ছেদ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে এমন প্রশ্ন করলে শাহরিয়ার মোক্তার বলেন, সরকারী জমিতে স্থাপনা নির্মান করলে তা উচ্ছেদ করা হবে।

কক্সবাজারে শত শত এক খাস জায়গা বেদখল থাকলেও তা উচ্ছেদ না করে হাইকোর্টের আদেশ থাকা সত্বেও জলবায়ু উদ্বাস্তু অসহায় পরিবারগুলোকে উচ্ছেদ করতে কেন ২৪ ঘন্টার আল্টিমেটাম, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন-নিউজ করার জন্য যতটুকু তথ্য প্রয়োজন আমি ততটুকু তথ্য দিয়েছি।

দৈনিক আমাদের সময় ডট কম ও দৈনিক আমাদের অর্থনীতিকে বলেন- আমি রীট মামলার নিষ্পত্তি করেছি। সুতরাং এখানে করা স্থাপনা উচ্ছেদ করা হবে।

নিষ্পত্তি করা হলে আপনাকে কেন হাইকোর্ট কর্তৃক কনটেম্পট করা হলো এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, কেন কন্টেম্প করা হয়েছে আমি জানিনা। আমি এর জবাব দেবো।

হাইকোর্ট উচ্ছেদ না করতে নির্দেশ
দিয়েছেন কিন্তু কেন তা পালন না করে কেন উচ্ছেদ করা হবে এমন প্রশ্নে শাহরিয়ার মোক্তার গড়িমসি করে একই ভাবে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলতে থাকেন- স্থাপনাগুলো উচ্ছেদ করা হবে।

উর্ধ্বতন কোন কর্তৃপক্ষকে উচ্ছেদ করতে নির্দেশ দিয়েছে কিনা এমন প্রশ্নও তিনি কৌশলে এড়িয়ে যান।

মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে একটি প্রভাবশালী মহলকে জায়গাটির দখল বুঝিয়ে দেয়ার জন্য উদ্বাস্ত পরিবারগুলোকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে কিনা ভুক্তভোগীদের অভিযোগ সম্বলিত এমন
প্রশ্নে শাহরিয়ার মোক্তার বলেন-কেউ যদি এরকম অভিযোগ করে থাকেন আমার কিছুই বলার নেই।
আমি আইনগতভাবে ব্যবস্থা নেবো।

হাইকোর্টে মামলা চলাকালীন উদ্বাস্তুদের দখলীয় আবেদনকৃত জায়গায় স্থাপনা করতে কোন বাধা আছে কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন-হাইকোর্টতো এমন আদেশ দেবেনা। এছাড়াও হাইকোর্টের বিভিন্ন আদেশ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলেও তিনি কোন সদুত্তর দেননি৷

ভুক্তভোগীরা বলেন, আমাদের বসতবাড়ি ঝিলংজা মৌজার সরকারী ১নং খাস খতিয়ানের ২০১৬৩ নং দাগের আন্দর এক একর জায়গার সুনির্দিষ্ট অবস্থানে। যার মামলা হাইকোর্টে চলমান।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসক, সদর সহকারী কমিশনার (ভুমি) সহ সংশ্লিষ্ট সবাই বিষয়টি সম্পর্কে অবগত রয়েছেন। আর ২০১৬৩ নং দাগে মোট খাস জমির পরিমান ৯৪.১৮ একর জায়গা।

এটা ছাড়াও কক্সবাজারে শত শত একর সরকারী জমিতে কয়েক লাখ মানুষ বসবাস করলেও তাদেরকে উচ্ছেদ না করে সদর সহকারী কমিশনার (ভুমি) শাহরিয়ার মোক্তার কর্তৃক শুধুমাত্র আমাদের মত অসহায় জলবায়ু উদ্বাস্তু পরিবারের বসতবাড়িগুলোতে কেন ২৪ ঘন্টার মধ্যে উচ্ছেদের হুমকী দেয়া হলো তা আমাদের বোধগম্য নয়।

মহামান্য হাইকোর্টের আদেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে কোটি টাকার মিশন বাস্তবায়ন করতেই এসিল্যান্ড শাহরিয়ার মোক্তার আমাদেরকে উচ্ছেদ পূর্বক একটি প্রভাবশালী মহলকে উক্ত জমির দখল বুঝিয়ে দিতে সম্পুর্ন বে-আইনীভাবে আমাদের বসতবাড়ি উচ্ছেদের পাঁয়তারা চালাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।

উদ্বাস্তু পরিবারের পক্ষে রীটকারী মো: আয়াছ বলেন, বিগত প্রায় ১২ বছর ধরে উক্ত জমিতে বসবাস করে আসছি জেলার বিভিন্ন স্থানের জলবায়ু উদ্বাস্তু আমাদের ২০টিরও অধিক পরিবার।

বিগত ২০১৭ সালে উক্ত জমির লিজ চেয়ে কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের নিকট আবেদন করেন ২০টি পরিবার।

আবেদনটি দীঘদিন ফাইল বন্দী থাকায় সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে রীট করা হয় । যার রীট পিটিশন নং-১০৩৫৪/১৮।

রীট মামলাটির শুনানীকালে মহামান্য সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ আবেদনকৃত ২০ পরিবারকে ৫শতক করে মোট এক একর জমি লীজ বন্দোবস্তি দেয়ার নির্দেশ দেন।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসক এই আদেশটি বাস্তবায়ন করতে কক্সবাজার সদর
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভুমি) কে নির্দেশ দেন।

কিন্তু ততকালীন সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভুমি) নানা অজুহাতে হাইকোর্টের আদেশ বাস্তবায়ন না করে সময় ক্ষেপন করতে থাকলে এবং একই সময় কক্সবাজারের বিভিন্ন স্থানে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হওয়ায় বসত ভিটা রক্ষায় পুনরায় মহামান্য সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্টে“ কনটেম্পট পিটিশনচ্ দায়ের করা হয়। কনটেম্পট পিটিশন নং-৬৫/২০।

এই পিটিশনের প্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত ২০ পরিবারকে কোন প্রকার উচ্ছেদ না করার জন্য এবং বন্দোবস্তি প্রদান পূর্বক উচ্চ আদালতে ফিরতি রিপোর্ট
দাখিলের নির্দেশ দেন কক্সবাজার জেলা প্রশাসক, সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভুমি), তহশীলদার (সদর) সহ সংশ্লিষ্ট সকলকে। যার কার্যক্রম বর্তমানে চলমান রয়েছে।

শুধু তাই নয়, হাইকোর্টের আদেশ ছাড়াও উক্ত জমির বিষয়ে এডিএম ও জেলা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এর আদালতে পৃথক দুটি মামলাও চলমান রয়েছে।

এতো কিছুর পরেও কোন কিছুর
তোয়াক্কা না করে এসিল্যান্ড উদ্যেশ্য প্রনোদিত হয়ে উচ্ছেদের হুমকী দেয়া হাইকোর্টের আদেশকে অবমাননার সামিল। কিন্তু হাইকোর্টের আদেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে আদেশটি বাস্তবায়ন না করে উল্টো ২৪ ঘন্টার মধ্যে উচ্ছেদের নির্দেশ দেন এসিল্যান্ড।

মুলত: লায়ন মুজিব, আরিফ, কাদের, চট্টগ্রামের হারুন-রিচার্ড গংয়ের কোটি টাকার মিশন বাস্তবায়ন করে উদ্বাস্তু পরিবারগুলোকে উচ্ছেদ করে উক্ত জমির দখল তাদের কাছে বুঝিয়ে দিতেই সদর
এসি ল্যান্ডের এমন নানামুখী পাঁয়তারা বলে দাবী করেন ভুক্তভোগীরা।

ট্যাগ :